নামঃ শৈহাইনু মার্মা

গল্পঃ মাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার দুটো ঘটনা মনে পড়ছে খুব। প্রথম ঘটনা: "ভাঙা হাতে সংসার " বয়স তখন সাত কি আট।বর্ষা শুরু হয়েছে মাত্র। একদিন মা শুকনো কাঠ সংগ্রহ করতে গেছিল। সেদিন সকাল বেলা রান্না বান্না করে তিনি বের হয়েছিলেন।ফিরলেন বিকেল তিন কি চারটে বাজে।আমরা তখনো কিছুই বুঝতে পারিনি তার সাথে কি হয়েছে। তিনি গোসল সেরে টুঁ শব্দ পর্যন্ত না করে শুয়ে গেছেন। অনেক দূর হাঁটা পথ,তাও আবার গরমে!ক্লান্ত লাগাটাই স্বাভাবিক। তাই তার ঘুমানো আমাদের কাছে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। সন্ধ্যা সাত কি না ছয়টার দিকে তার ঘুম ভাঙে এক পিসির ডাকে।তখন পিসির কাছে জানতে পারি যে, মা পিছলে পড়ে আঘাত পেয়েছে হাতে।পিসির কাছে ঘটনা জানার পর মাসি এসে দেখে মায়ের হাত নড়তে অসুবিধে হচ্ছে। আর বুঝতে পারলাম না, হাতের আঘাতটা ছোটখাটো নয়।হাসপাতালে গিয়ে দেখি তার হাত মচকে গিয়ে ভেঙে গেছে। তার কি কষ্ট। কিন্তু আশ্চর্য মা টুঁ শব্দ পর্যন্ত করলেন না, সবকিছু সহ্য করে গেলেন। তিনি শুধু মুখে বললেন, " কয়েকদিন আরাম পেলেই সুস্থ হবেন। " হাত ভাঙার পরও মা ফ্যামিলির ক্রাইসিস মাথায় নিয়ে কষ্ট সহ্য করে গেছেন আর ভাঙা হাতে বাড়ির সব কাজের তদারকি করা, কোথায় কার কি লাগবে,কি রান্না হবে সবদিকেই তার সমান দৃষ্টি। কি এক বলিষ্ঠ চরিত্র মা! দ্বিতীয় ঘটনা: "আলোর বাতি জ্বালিয়েছিল যিনি" ছোটবেলায় এলাকায় এক ম্যাডাম থাকতেন,নাম তার পারুল ম্যাডাম।সবাই তাকে ভয় করে।পড়াশোনায় তিনি যেমন কড়াকড়ি করেন, স্টুডেন্টদের শায়েস্তা করার বেলাতেও তিনি অনন্য। মা একদিন ওখানেই ভর্তি করিয়ে দিয়ে ম্যাডামকে বলে গেলেন, " ছেলেটা অনেক দুষ্টু,পাছায় বেত দিলেই ঠিক হবে!" তারপর থেকে ম্যাডাম শুধুই পড়া ধরে, কান মলে দেয়।কি যে যন্ত্রণা! আর বাসায় এলে পড়া মুখস্থ না হওয়া পর্যন্ত ঘুমাতে দিতেন না।পান খাইতেন আর জেগে জেগে আমায় পাহারা দিতেন। পড়তে যখন খুব অলস লাগত, মাকে কত না গালি দিয়েছি মনে মনে।শুধু চিন্তা করতাম, কবে পড়াশোনা শেষ হবে আর পাখির মত স্বাধীন হয়ে উড়তে পারব।পড়তে পড়তে মন যেত মার্বেল খেলায়,দাঙ্গুলি খেলায়। আর কতবার যে ঝিমাইতাম! মা টের পেলেই কান মলে দিত।কত যে কান্নাকাটি করেছি পড়াশোনা না করার অজুহাতে। স্কুল ফাঁকি দিয়েছি পেট ব্যাথা,জ্বর,মাথা ব্যাথার অজুহাতে। মা যখন বুঝতে পারে যে, ছেলেটা অভিনয় করছে তখন কি যে বকানি! স্কুল পর্যন্ত পৌঁছাই দিত ব্যাগসহ। আর আজ সব স্মৃতি এইসব।স্মৃতিগুলো যখন ফিরে আসে তখন আনন্দ পায়,আবার মাকে মনে মনে বকানি দেওয়ার জন্য খুব লজ্জা পায়,খারাপ লাগে।আজ মা যদি এইসব অভ্যাস না শেখাতো,পড়াশোনার আলো কিংবা ভালো কিছু না জ্বেলে দিত আজ হয়তো এতদূর আসতেই পারতাম না। মা মানেই বিশেষ কিছু। মা শব্দটি খুব ছোট কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সব। হাসি-কান্না,দুঃখ, বেদনা আর সব অনুপ্রেরণার মশাল তো মাকে নিয়েই।অনেক ভালোবাসি মা। পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুক।ভালো রাখুক সকলকে।

Share বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন