নামঃ তাসরিফা পুষ্পিতা রশ্নী
গল্পঃ মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে..." এই ধরণীতে মা সন্তানের সম্পর্ক মহান সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত এক স্বর্গীয় অনুভূতি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমত আমাদের মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা।।। মা কর্মজীবী হলে শুনেছি সন্তানদের সাথে তার বন্ডিং অত জোরালো হয় না। আমাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। মা বলে ডাকলেও মানুষটি শুধুমাত্র আমাদের মা নয়। এই মানুষটি পৃথিবীতে আমাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তবে ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের কথা কাটাকাটিও হয়। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে তীব্র ভালোবাসাময় এক দুষ্টু মিষ্টি সম্পর্কে আমরা পরস্পরের প্রতি আবদ্ধ।।। আমাদের মমতাময়ী মা সকাল সাড়ে আটটায় বাসা থেকে বের হয় আর বিকেল পাঁচটার সময় বাসায় আসে। পবিত্র মাহে রমজান মাসে প্রচন্ড গরমে ক্লান্ত মন আর ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে তিনি ১৫ রমজান পর্যন্ত স্কুল করেছেন। কর্মজীবনে হাজার ব্যস্ততার সত্বেও এই মানুষটি আমাদের দুই বোনকে সময় দেয়ার চেষ্টা করেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মায়ের সাথে চায়ের কাপে ঝড় তুলে আমাদের আলোচনা হয় সারাদিন কেমন কাটলো। আমাদের সকল কথার একজন ধৈর্যশীল শ্রোতা হচ্ছেন প্রজাতন্ত্রের এই কর্মচারী।।। কলেজের কলা ভবনের সামনে নাম না জানা অদ্ভুত রকমের গাছ আছে, সেই গাছে বিচিত্র ফল ধরে, মাঝে মাঝে একটা বোকা কোকিল পাখি এসে অসময়ে ডাকাডাকি শুরু করে, কলেজের প্রাকৃতিক আবহ দেখে বিমোহিত হয়ে সে বোঝেনা যে কোকিলেরা বসন্তকালে ডাকে। কলেজে পলাশ ফুল গাছ আছে, সরকারি চত্বরে জামরুল গাছ থাকায় সেই জামরুল পারমিশন ছাড়া চুপিচুপি ব্যাগে করে নিয়ে আসলেও কেউ কিছু বলে না। কলাভবন এর সামনে আমগাছটা একটুও সুন্দর না। প্রতিবন্ধী আম ধরে সেই গাছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে সেই আম গাছ কোনো সুন্দরী ললনার আকর্ষণের বিষয় হতে না পারার কষ্টে প্রায় প্রায় আমাদের দুই বোনের কাছে মরে যাওয়া অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। অবসর সময়ে আমরা সেই আম গাছকে সান্ত্বনা দেবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাই।আমাদের পোষা কুকুর আইলেটসকে আজকাল পাশের বাড়ির ফিরিঙ্গি নামক কুকুরটির সাথে প্রাত ভ্রমণে বের হতে দেখা যায়। বিষয়টি ঘোর সন্দেহজনক। পোষা বিড়াল সোফি আজকাল আমাদের দুই বোনকে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না... ইত্যাদি কত প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় কথা নিঃসংকোচে যাকে বলা যায় সেই তো আমার মা, বিশ্ব ভুবন মাঝে যাহার নেই কো তুলনা।।। মজার বিষয় হচ্ছে,এতো ব্যস্ততার মধ্যেও মা আমাদের এই অবান্তর এবং অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন। গল্পগুজব করার সময় মা কখনোই আমাদের সাথে রাগ করেন না। বরং আমাদের সাথে প্রত্যেকটি বিষয়ে তার ব্যক্তিগত মতামত ব্যক্ত করে। হাজার কর্মব্যস্ততার মাঝেও সকল পড়া ঠিক করে করছি কিনা সেই ব্যাপারে সে নজর রাখে, কলেজের ক্লাসে শিক্ষকদের পড়া ঠিক করে লিখে আনছি কিনা সেই ব্যাপারে খাতা চেক করে, ফেসবুকে কেন বেশি সময় ব্যয় করলাম সেই কৈফিয়ত ও যুক্তি তর্কের মাধ্যমে তার সামনে উপস্থাপন করতে হয়। আম্মু কোনো মানুষকে পছন্দ করলে সেই মানুষের প্রতি আমাদেরও একটা অন্যরকম ভালো লাগা চলে আসে।তিনি এমন একজন ব্যক্তি এই পৃথিবীতে যার সামনে নিঃসংকোচে চোখের পানি ফেলা যায়। আমাদের চোখের পানির মূল্য যে একজন মানুষের কাছে এত বেশি সেটা আমার আম্মুকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।ভেবে দেখলাম, আমাদের রাগ, মান অভিমান, অভিযোগ অনুযোগ সকল কিছু তার সাথেই।।। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে যখন ঘরে প্রবেশ করি তখন স্বর্গীয় প্রশান্তি আমাদেরকে জড়িয়ে ধরে শুধুমাত্র তার কারণেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে সরকারি স্কুলে চান্স পাওয়া, জীবনে প্রতিটি বোর্ড পরীক্ষায়( ৫ম শ্রেণি,৮ম শ্রেণি,১০ম শ্রেণি ) অংশ নিয়ে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করা, আমাদের বোর্ড পরীক্ষার আগে আম্মুর রোজা রাখা, উপজেলা,জেলা, বিভাগ, জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পাওয়া, আমাদের প্রতিটি প্রতিযোগিতার আগে তার বিনিদ্র রাত্রিযাপন আর সর্বপোরি ঐতিহ্যবাহী বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের মত নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য যোগ্য করে তোলার পেছনে যে মানুষটি নিরন্তর পরিশ্রম এবং অনুপ্রেরণা রয়েছে তিনিই আমাদের মা।।।। বিশিষ্ট উদার মনের মানবিক এই ভদ্রমহিলাকে প্রেমের কবি কাজী নজরুলের ভাষায় কৃতজ্ঞচিত্তে প্রেম নিবেদন করে বলতে চাই,, "নীড়ের পাখি যেমন মাগো আকাশ পানে ধায়, আকাশ পেয়ে খানিক পরে নীড়কে আবার চায়, তেমনি যেন স্বপ্নে আমি ভুবন ঘুরে আসি মা গো, তবু সবার চেয়ে তোমায় ভালোবাসি!!!!