নামঃ সজীব মাহমুদ
গল্পঃ ট্যালিপেথি ----------------- বাবার হঠাৎই চাকরী বদল হলো সিলেট শহরে। বাবা আমাকে সাথে করে নিয়ে গেলেন শহরে। ভর্তি করিয়ে দিলেন শহরের একটি স্কুলে । আর আমার ছোট ভাইটিকে থেকে গেলো মায়ের সাথে। আমি সবে তখন প্রাইমারী স্কুল ডিঙিয়ে হাইস্কুলে পা দিয়েছি । চঞ্চলতা বয়সে কাটেনি তখনো। গ্রামের মাঠ, ঘাট আর কাঁদা মাটি আর মায়ের আঁচল ধরে আমার বেড়ে উঠা। হঠাৎ ইট পাথরের এই বিশাল শহরে আমাকে বড্ড বেমানান মনে হতো। মায়ের কথা মনে পড়তো, ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়তো, পাড়ার ফুটবল খেলার কথা মনে পড়তো। মা আমাকে সাপ্তাহে সাপ্তাহে চিঠি দিতেন। মন দিয়ে পড়তে বলতেন, চিন্তা না করছে বলতেন। গ্রাম থেকে কেউ এলে সাথে করে বাড়ির সবজি, মাছ পাঠিয়ে দিতেন। আমার এসবে মন ভরতো না, মনে হতো কবে ছুটি পাবো। কবে মায়ের গন্ধ নিবো, মাকে কবে দেখবো। মায়ের আঁচল ধরে এতদিন বেড়ে উঠা আমার তখন একেকটা দিন খুব নি:সঙ্গতায় কেটেছে। মনে হয়েছে সব থেকেও যেন একটা বড় শূন্যতা ঘিরে আছে চারপাশে। এ শূনতা মা ছাড়া কোন কিছুতে ঘুচবে না। বাবা বিষয়টা বুঝতেন। বাবার এত ভালোবাসায়ও মায়ের অভাব পূরন হতো না। এ এক অদ্ভুত শূন্যতা, যা প্রকাশ করা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়, হৃদয়ের গভীরে হৃদয় নিংড়ে অকারনে নাড়া নেয় সারাক্ষণ। বন্ধুদের কাউকে মায়ের সাথে দেখতে শূন্যতা যেন আরো বেড়ে যেতো। মনে হতো সব ছেড়ে মায়ের আঁচলে লুকাই, মায়ের কাছে লুকিয়ে চলে যাই। এর মধ্যে আব্বুর কোন কারনে দুদিনের জন্য ট্রেনিং চলে যায় । আমি সিলেটের ছোট্ট বাসাতে একাই থাকছি । অল্পকিছু দিন হলো তাই আশেপাশের কাউকে তেমন চিনিও না। আমি যেন অথৈ সাগরে পরলাম। একে তো মাকে ছাড়া এ শহর আমার কাছে নতুন, এখন বাবাও নেই । এর মধ্যে জ্বর আসলো, তখনকার সময় মোবাইল ছিলো না, এমন কি টেলিফোনও এত সহজলভ্য ছিলো না। কাউকে কিছু জানানোর সুযোগ নেই। আমার জ্বর রাতে বাড়তেই থাকলো। এক সময় আমার খিদে পায় গভীর রাতে, আমি ভাত রান্নার চেষ্টা করেও পারি নি। খিদে আর জ্বরে আমি শয্যাগত। আবার জ্বরের সাথে বমিও হচ্ছে। শরীর একেবারে নিস্তেজ। সকাল দশটায় দরজায় নক হলো, আমি কোন রকম শক্তি সঞ্চয় দরজা খোলে তো অবাক! মা দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলাম জ্বরে হয়ত এলোমেলো কিছু দেখছি। পরে বুঝলাম সত্যিই মা এসেছেন । আমার মা এমন অবস্থা দেখে কান্নায় জড়িয়ে ধরলেন। আমি সব বললাম। মা জানালো আরো অদ্ভুত কথা- মা না কি গত রাতে স্বপ্নে দেখেছে আমি খুব অসুস্থ তাই চাকরী থেকে দু দিনের ছুটি নিয়ে চলে এসেছে ছোট ভাইকে সাথে করে। মায়ের অফুরান যত্ন আর যাদুর স্নেহে জ্বর দুদিনেই পালালো। বাবাও এলেন। আমাকে সারিয়ে তুলে মা বাড়ি গেলেন। আমি শূন্যতায় অভ্যস্ত হওয়ার ভান করে বড় হতে লাগলাম। ত্রিশ বছর আগেকার ঘটনা আমার কাছে আজও অদ্ভুত মনে হয়। ব্যাখ্যারও অতীত মনে হয়। আচ্ছা, সব ময়েরাই কি এমন হয়? সব ময়েরাই কি এমন অদৃশ্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়? মায়েরা আসলেই অদ্ভুত মায়াময় ধাতু নিয়ে তৈরি, যার বাইরে শক্ত হলেও ভিতরটা ভালোবাসাময়।