নামঃ মঈন হাসান
গল্পঃ মা শব্দটাই আমাদের জন্য অনেক বেশি আবেগের। আমরা দেখে আসছি এবং এখনো দেখি, আরো অনেক শব্দের চেয়ে ‘মা’ শব্দের প্রতি আমাদের প্রেমটা বেশি। বলা হয়, আমাদের প্রথম শেখা শব্দ মা। মায়ের সাথে ঘামে-গন্ধে বড় হতে থাকি আমরা। আমরা কখনোই বুঝতে পারিনা, এই বড় হতে থাকা জীবন থেকে হঠাৎ করে মা অথবা পুত্র-কন্যা যে কেউ আলাদা হয়ে যেতে পারি যেকোনোভাবেই, হয়তো কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা হতে পারে অনির্দিষ্টও। যখন সেসময়টা কোনোভাবে হাজির হয় আমাদের কাছে, অনেকদিন যাবার পর আমরা হয়তো বুঝি বা বুঝিনা- কিন্তু আমরা যখন ভাবি, আমাদের মন খারাপ হতে থাকে, স্মৃতিপোড়া গন্ধ নাকে আসে, চোখও তো ভিজে যায় কতবার। আমার আম্মু, মঞ্জুয়ারা বেগম। আমি আম্মু বলি ছোট থেকেই। অনেকে মা ডাকে, আম্মা ডাকে বা আরো অনেকরকম ডাক আছে মায়েদের। আর অনেকের মতোই আব্বুর চেয়ে আম্মুর কাছে আবদার-আদর, এসবের বায়না থাকত বেশি। কোথাও যাব, কিছু কিনবো, কিছু খাব- আম্মুর পিছে পিছে ঘোরার ব্যাপারটা ছিল সবসময়। আমার মনে পড়ে খাওয়া-দাওয়ার পর আম্মুর শাড়ির আঁচলে একটা দীর্ঘ সময় নিয়মিতভাবে হাত মুছতাম। এখনো মাঝেমধ্যে তা করি। শাড়ির আঁচলের পিছনে ঘুরতে ঘুরতেই আবদার করে বসেছি হয়তো কখনো একটা ক্যারাম বোর্ড কিনে দেবার জন্য, একটু বড় হয়ে যাবার পর একটা বাইসাইকেল, একটা মোবাইল ফোন বা ঘুরতে যাবার কথা বন্ধুদের সাথে- এসব কিছুই আব্বুর কান পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। আর সেই দায়িত্বটা অবশ্যই আম্মুর। আর আমার দায়িত্ব আঁচলে বাঁধা পড়ে যতক্ষণ ঘোরা যায়। আম্মুর সাথে ঘুমানোর কথা আমার মনে পড়ে। আলাদা বিছানা হওয়ার আগ পর্যন্ত রুটিন ছিল, আম্মু আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর আমার চোখে আস্তে আস্তে ঘুম চলে আসছে। সে কি শান্তি! এই শান্তির ব্যত্যয় ঘটলে সাধারণত ঘুমের সাথে আমার সংঘর্ষ হয়ে যেত। কখনো মনে হয় নাই এই শান্তিও বদলাবে। কিন্তু বড় হওয়া এমন এক অসুখ, অনেককিছুই তো বদলে গেল। গোসল করা নিয়ে প্রতিদিন দুপুরবেলা আম্মুর সাথে একরকমের যুদ্ধ হয়ে যেত। আমি দৌড় দিতাম পাশেই আমার খালার বাড়িতে। এখানে-সেখানে লুকিয়ে পড়া আর আম্মুর হাঁকডাক, আমি বের হতে চাইতাম না। আম্মু যেভাবে ঘষামাজা করে গোসল করায়, তা আমার ভালো লাগত না বলেই এই দৌড়ঝাঁপ। তবুও ছাড়া পাওয়া যেত না। আম্মুর হাতে গোসল দিতে গিয়ে চোখের পানিও কি পড়েছে? এখন আর মনে নাই। ছোটবেলায় আরো অনেকরকম জ্বালা-যন্ত্রণাই আম্মুর সাথে করা যেত। যেন আম্মুকে যন্ত্রণা দেওয়াই তিন কন্যা পর যে পুত্র, তার কাজ। আমি অবশ্য খুব বেশি যন্ত্রণা দিতাম কি? তবুও রান্না করার সময় গামলার মধ্যে উঠে যাওয়া, হঠাৎ করে কাপড়ের আলনাসহ চিতপটাং হয়ে যাওয়া বা উঠানে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে রান্নাঘরে বল চলে যাওয়া নিয়ে যন্ত্রণাগুলি থেকে আম্মুর মুক্তি ছিল না। স্কুল জীবন শেষ করার পর বাড়ি ছাড়লাম। কলেজ জীবন কাটল গাজীপুরে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কাটছে ঢাকায়। পড়াশোনাও প্রায় শেষ। সেই বাড়ি ছাড়া জীবন এখন বছরে তিন থেকে চারটা ছুটিতে বাড়ি যায়। আম্মুকে দেখি। আম্মুর বয়স বাড়ে। সকল কাজ করে যায় সারাদিন। অনেককিছু মনে রাখতে হয়তো সমস্যা হয় এখন। পুত্র ছুটিতে বাড়ি গেলে মায়ের ছোটাছুটি আরো বাড়ে। আম্মুর কন্যারাও তখন বাড়িতে আসে। আসে কন্যার কন্যারা, আম্মুর নাতনিরা। আম্মুর ব্যস্ততা যেন আরো বাড়ে। আমি দেখি দিনের পর দিন একজন মানুষ সংসারে কতটা শ্রম দিয়ে গেল। আমাদের অসুখে-বিসুখে সবসময় অগ্রগামী থাকল। আরো কত কিছুই হয়তো করার ছিল আমার মায়ের, আমাদের মায়েদের। তারা কি তা করে সবসময়? ভাবি, তারা তো শুধু মা না। তারা মহীয়সী। ভালো থাকুক ধরণীর সকল মা।