নামঃ Sharmin Rahman

গল্পঃ আমার বয়স তখন ৮।আমি সব সময়ই আব্বুর নেওটা।আব্বু কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় থাকে দুই কি তিন মাস পরে একবার আসে। সে আসাও আমার জন্য যথেষ্ট হয় না কারণ আব্বু অনেক কাজ নিয়ে আসে সেসব কাজ করতে করতে আব্বু ফেরে রাতে আর আমি ঘুমিয়ে যাই।আব্বুর সাথে কথাই হয় নি।তারপর এ মাসে আব্বু এলোই না।বাসার খরচের হিসাব আমি বুঝি না। এই মাসে আম্মু চিঠি লিখে টাকা চেয়ে পাঠানোর চেয়ে ছোট চাচাকে পাঠিয়ে টাকা আনানো প্রয়োজন মনে করল।তাই ছোট চাচাকে ডেকে পাঠানো হলো আব্বুর কাছে যাওয়ার জন্য। আমি ঘুরে ঘুরে সব কথা শুনলাম। আমার ছোট মনে আব্বু কে দেখার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠলো।আম্মুর পেছনে পেছনে ঘুরতে লাগলাম আম্মু আমি চাচার সাথে আব্বুর কাছে যাবো। আম্মু বলল না তুই ওখানে গিয়ে আমার জন্য কাঁদবি। আমি মন খারাপ করে বললাম একটু ও না আমার তোমার জন্য কান্না আসবে না। মা বলল তোর চাচা দুই দিন ভাইয়ের সাথে থাকবে। তুই রাতে আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারবি না।রাতে কান্নাকাটি শুরু করলে তোর বাবা বিপদে পরে যাবে। আমি নাছোড়বান্দা আমি অনেক কাকুতি মিনতি শুরু করে দিলাম। বললাম আমি তোমার জন্য কাঁদব না।এমনিতেও তোমাকে আমার বেশি পছন্দ না।আমি আব্বুকে বেশি পছন্দ করি।আমার কথার কারণে হোক আর অন্য যে কোন কারণে ই হোক আম্মু আমাকে যেতে দিতে রাজি হলো। তবে চাচাকে নানা ভাবে বুঝিয়ে দিতে লাগলো আমাকে কিভাবে নিয়ে যাবে। কিভাবে রাখাবে, কি খাওয়াবে ইত্যাদি। আমি বাসে চড়লে বমি করি।এজন্য চাচাকে বলল ওকে লঞ্চে করে নিয়ে যাবি আর ও সাতার জানে না তাই সব সময় কাছে কাছে বসিয়ে রাখবি।লঞ্চে ঝালমুড়ি পাওয়া যায় কিনে দিস মরিচ দিতে না করবি ইত্যাদি আরও একশত ফর্দ দিল। এতো কিছু আমার মায়ের খেয়াল থাকে দেখে আমি অভিভূত। তারপর চাচাকে টাকা দিল।চাচা বলল ভাবী যতকিছু করতে বলছেন আরও একশ টাকা লাগবে। তখন একশ টাকার অনেক দাম।আমাদের ও টানাটানির সংসার।তার ওপর আর্থিক অনটন শুরু হয়েছে বলেই তো চাচাকে পাঠিয়ে টাকা আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে তবুও মা কোথা থেকে যেন একশ টাকা যোগাড় করে দিল।আর বলল ভাড়া বাঁচাতে ওকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাস না।তোর দাদাকে বলবি ওকে যেন তোর হাবিব দাদার বাসায় নিয়ে রাখে মেসে যেন না রাখে।চাচা বলল হইছে আর কত ফর্দ দিবেন।এমনই আমি ছোট পোলাপান নিয়ে কোথাও যেতে চাই না। আসার সময় মা আঁচলের খুট খুলে বিশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল সাবধানে থাকবি আর কিছু কিনতে ইচ্ছে করলে এই টাকা দিয়ে কিনবি।আর চাচার সাথে সাথে থাকবি ঢাকায় কিন্তু অনেক গাড়ি আব্বা আর চাচার হাত ছাড়লে কিন্তু হারিয়ে যাবি আমাকে আর দেখতে পাবি না।এই কথা শুনার পর থেকে আমার মন কেমন করা শুরু হলো।আমরা রিকশা করে লঞ্চ ঘাটের দিকে রওনা হলাম। এমনিতে পর্দা রক্ষার জন্য ই হোক বা আশেপাশে বয়োজেষ্ঠ আত্মীয়রা থাকার কারনেই হোক মা বাড়ির বাইরে রাস্তার ধারে কখনও আসে না। বাজার অথবা যেকোনো প্রয়োজনীয় কাজ পাড়া প্রতিবেশী চাচাদের অনুরোধ করে করিয়ে নেয়।আজ রাস্তার ধার পর্যন্ত এলো বার বার নদীর পানির কাছে যেতে মানা করে দিল।নদীতে হাঙর আছে বলেও ভয় দেখাল।আমি এখন একটা শব্দ ও করছি না।কারণ এখন কিছু বলতে গেলেই কেঁদে ফেলব।আমি এখন জল টলমল মেঘের মতো হয়ে গেছি একটু ছোয়া দিলেই ঝরঝর করে ঝরে পড়ব।আমাকে নিয়ে চাচা রিকশায় চড়ে বসেছে। রিকশা চলতে শুরু করেছে আমি চুপ করে মা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে দূরে সরে যেতে দেখছি আর নিজের ভেতরের কান্নাটা চেপে বসে আছি। আম্মু অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি আর কোনদিন বাড়ি ফিরতে পারব না। আর মা আর ছোট বোনগুলোকে কোনদিন কাছে পাব না।লঞ্চে বসে আমি সারাক্ষণ চুপ করে ই রইলাম। চাচা মুড়ি কিনে দিল আমি খেলাম না।এক জায়গায় বসে রইলাম। আরও যা যা আম্মু কিনে দিতে বলেছিল সবই একে একে আমার সামনে হাজির করা হলো আমি একটা জিনিস ও মুখে দিয়ে দেখলাম না। চাচা আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে রেগে গেল।বলল এজন্যই বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যেতে চাই না। এখন মায়ের জন্য মন খারাপ করে বসে আছে কেমনটা লাগে। আমি আব্বুর কাছে গিয়ে ই প্রথমে বললাম আব্বু আম্মুর কাছে নিয়ে যেও কালকেই। আব্বু বলল তুমি আসছ কেন আম্মুকে রেখে। আমি চুপ করে রইলাম। তারপর ঢাকার দুই তিন জায়গা ঘুরে চাচার বাসায় ঘুরে তিন দিন কেটে গেল।এই তিনদিনে আমি যৎসামান্য খাবার খেলাম আর কারো সাথে ই খুব একটা কথা বললাম না।আমার কেবল কান্না পায়।বিভিন্ন আড়ালে গিয়ে একটু করে কাদি।খাবারের স্বাদও পছন্দ হয় না। চাচী কেমন করে যেন রান্না করে আমি খেতে পারি না। আর শহরের মানুষ কত জটিল করে সবকিছু চিন্তা করে। আম্মুতো কখনও এতো প্যাচ বোঝে নাই। সব অপেক্ষার অবসান হয়।আমার অপেক্ষারও অবসান হলো আব্বু বাড়ি ফিরবে আমাকে নিয়ে নদী পাড় হয়ে নদীর পাড়ের বাজারে ঢুকলাম আমরা এবার আমি আম্মুর দেয়া বিশ টাকার নোটটা বের করলাম। আব্বু কে বললাম আম্মুর জন্য ইলিশ মাছ নিই আব্বু এই টাকা দিয়ে। আব্বু হেসে ফেলল বলল আমাকে দাও টাকা টা আমি দরদাম করে মাছ কিনে দেই।আমি আব্বু কে টাকা দিলাম আব্বু মাছ,কিছু জামা-কাপড়,আরও কয়েক ধরনের খাবার কিনে রিকশা নিল।আমি বাড়ি যাচ্ছি আম্মুর সাথে দেখা হবে। দেখা হলে কী বলব তাই নিয়ে মহা চিন্তা। বাড়ির কাছে আসতে ই আম্মু আমাকে এগিয়ে নিতে এলো। আমার ভেতরে জমানো কান্না এতক্ষণে পথ পেল।আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল তুই না বললি আমাকে ছাড়া কাঁদবি না এখন দেখেই কান্না শুরু। আমি আর কোন কথা বললাম না। চাচা আর আব্বা এতক্ষণে আমার গভীর্যের কারণ খুঁজে পেয়ে হাসতে হাসতে বলল কে বলেছিল বাহাদুরি করে মায়ের কাছে থেকে যেতে।

Share বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন