নামঃ সৌমেন্দ্র গোস্বামী
গল্পঃ আমার মা, আমার পৃথিবী সৌমেন্দ্র গোস্বামী পরিবার, নদী পারাপারের নৌকার মতোন। যেখানে মাঝির ভূমিকায় থাকেন বাবা; মা নিজে স্বয়ং নৌকা। আর আমরা সন্তানেরা হলাম যাত্রী। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরিবার নামের সোনার তরীটিকে অর্থ, বিত্ত, বৈভবসহ নানা নিরিখে বিভিন্ন ভাবে ভাগ করা হয়। ওই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবার। বাবার একার উপার্জনে চলে সংসার। সকালের টুথপেস্ট থেকে ইলেকট্রিক বিল সমস্ত কিছুর চাপ বাবার ওপর। ফলে পড়ালেখার প্রয়োজনীয়তার বাইরে কোনো কিছুর আবদার করার আগে হিসেব কষে নিতে হয়। মানে বিষয়টা মোটেই এমন নয় যে, আবদার করলে মা-বাবা বকাবকি করেন বা আবদার পূরণ করেন না। বরং ঠিক এর উল্টোটা, মুখ ফুটে কিছু চাইলে আমাদের আবদার-প্রয়োজন মিটাতে বাবা নিজের ওষুধ না কিনে কিংবা মূল্যবান কিছু বন্ধক রাখা বা বিক্রি করার প্রয়োজন হলেও কার্পণ্য করেন না। তাই বলে আমি ও বোন দুই জনের কেউই অহেতুক আবদার করি না। আমাদের চাহিদা সীমিত কিন্তু স্বপ্ন অনেক বড়। না, নিজে নিজে এই বোধ প্রাপ্ত করিনি আমরা। মা, ছেলেবেলা থেকে শিখিয়েছেন কিভাবে অল্পে তুষ্ট হতে হয়। নিজের থালার খাবার অন্যের সঙ্গে ভাগ করে খেতে হয়। মাঝে মাঝে এই মহীয়সীকে দেখে মুগ্ধ হই। কি চমৎকার ভাবে জীবনের সমস্ত শখ-আল্লাদ গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তিনি! আমি সৌভাগ্যবান। শিশুকাল থেকে বাবার স্নেহে ও মায়ের আঁচলের ছায়ায় বড় হতে পেরেছি। রোদ, বৃষ্টি, উত্তাপ কোনোটিই গায়ে লাগেনি। সৃষ্টিকর্তার অশেষ করুণায় এখনও তাঁদের ছায়াতে আছি। শুধু দৃশ্যপট বদলেছে। আগের মতো সবসময় কাছাকাছি থাকার সুযোগ নেই। পড়ালেখার জন্য দূরে থাকতে হয়। আঁকা-বাঁকা সরণির মতো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মায়ের সঙ্গে রয়েছে মধুময় স্মৃতি। কথা কাটাকাটি, মতের অমিল যে একেবারে হয় না তা বললে মিথ্যে বলা হবে। হয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মা নিজেই আমাদের মান ভাঙায়। বেশি সময় রাগ করে থাকতে পারেন না। ভাবতেই আশ্চর্য হই, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর কোচিং এ যেতে হবে। কিন্তু মাকে ছেড়ে দূরে থাকতে পারব না ভেবে তখন কি কান্নাটায় না করেছিলাম। সব ছুড়ে ফেলে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, ‘বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না। আর যেতে হলে মাও যাবে আমার সঙ্গে।’ কিন্তু মা বাধা দিয়েছিলেন। পুনরায় ব্যাগ গুছিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে যাবে। জীবনে বড় হতে হবে বাবা, অনেক বড় হতে হবে।’ সেদিন মোটেই মিথ্যে বলেননি মা, থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। জীবন বোধ হয় এমনই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত দুঃখ-কষ্টের রং বদলে যায়। অনেক না পারাতেও আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠি। পরিষ্কার মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যখন টিউশুনি শুরু করলাম মা শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু পাছে টাকার মোহে পড়ালেখা নষ্ট করে ফেলি ভেবে শান্ত স্বরে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘আগে কিন্ত পড়ালেখা বাবা। টাকায় সব কিছু নয়; টাকার চেয়ে সময় বেশি মূল্যবান। সময়ের কাজটা সময়েই করতে হয়। নিজের পড়ালেখা যেন নষ্ট না হয়।’ মায়ের এ নির্দেশনা কতটা কাজে লাগাতে পারব বা পেরেছি তা সময় বলবে। তবে সেদিন খুব খারাপ লেগেছিল। যেদিন বন্ধুর গিটারটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছি দেখে সে (বন্ধু) কথা শুনিয়েছিল। অভিমানে, দুঃখে, অপমানে মনে মনে শপথ করেছিলাম, গিটার কিনে তার চেয়েও ভালো গান গাইব। অভিজ্ঞতায় সম্পদ, কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিল। বোনের জন্য হারমোনিয়াম কিনে আনলে ফাঁকে ফাঁকে অল্প-বিস্তর বাজাতে শিখেছিলাম। আমার প্রচেষ্টা দেখে বোনের গানের শিক্ষক, কয়েকখানা গান তুলে দিয়েছিলেন। তখন কলেজে পড়ি। প্রথম বর্ষে। ইত্যাদি কারণে আত্মবিশ্বাস ছিল, ভালো গাইতে পারব। কিন্তু গিটার, তা কিনব কিভাবে? টিউশুনি করে যে ক-টাকা পায়; হাত খরচ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজে ব্যায় হয়ে যায়। বাবাকে বললে হাজার কষ্ট হলেও আবদারটা পূরণ করবেন তিনি। কিন্তু বাবার যে বড় কষ্ট হবে। সংসারের জন্য প্রতিনিয়ত নিজেকে বিলিয়ে চলেছেন মানুষটা। আর কত? ভেবে উপায় খুঁজতে শুরু করলাম। এর মধ্যে ঈদের ছুটি হলো। বাড়ি এলাম। ব্যস্ততার মধ্যে থাকলে স্মৃতির পোকা মনকে পোড়ায় না। কিন্ত নিরিবিলি নিঃসঙ্গ হলেই চিন্তায় মন ফেটে পড়ে। ‘গিটার কিনব কিভাবে?’ ভাবতে ভাবতে যারপরনাই ক্লান্ত আমি। শেষমেশ কথায় কথায় ইচ্ছেটার কথা মাকে বললাম। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘গিটারের কেমন দাম?’ ‘আট-দশ হাজারের মধ্যে হয়ে যাবে।’ মা বললেন, ‘অতো ভাবিস না, একটা না একটা ব্যবস্থা হবে।’ ছুটি শেষ। যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাচ্ছি। মা ঘরে এলেন, হাতে একটা ব্যাগ। তিনি ব্যাগ থেকে মাটির ব্যাংকটা বের করে আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এতে যে টাকা আছে আশা করি, তা দিয়ে গিটার হয়ে যাবে। গিটার কেনার পর যদি কিছু থাকে দুই-একটা জামা-কাপড় কিনে নিস।’ হতচকিত হলাম। ছোট থেকে দেখেছি, ভীষণ প্রয়োজনেও মা কখনো মাটির ব্যাংকে হাত দেননি। আমার চোখে জল দেখে না মনের খবর আঁচ করতে পেরে জানি না, মা, দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি আশায় সবচেয়ে বেশি ভরসা ও অনুপ্রেরণা যে মহিয়সীর থেকে পাই তিনি আর কেউ নন— আমার পৃথিবী, আমার মা। জানি, সবাই বিরুদ্ধে গেলেও মা কখনো হাত ছাড়বেন না। ঈশ্বরের মতো চিরদিন পাশে থাকবেন। মাঝে মাঝে বড় হয়ে যাচ্ছি ভেবে খুব আফসোস হয়। চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘তুমি বিশ্বাস করো মা, কতটা ভালোবাসি নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও; এটুকু কথা দিতে পারি, কোনোদিন বড় হওয়ার বাহানা করব না। চিরদিন তোমার কাছে, বাবার কাছে ছোট্ট শিশুটি হয়েই থাকব।’