নামঃ নাদির হোসেন

গল্পঃ মায়ের সঙ্গে কাটানো মধুর স্মৃতি রয়েছে অনেকগুলো। তবে সবচেয়ে যে মধুর স্মৃতি রয়েছে সেটির শেয়ার করার আগে , আমাকে ফিরে যেতে হবে একটু পিছনে। আমি তখন ক্লাস থ্রি কিংবা ফোর এ পড়ি । অতটা মনে নেই বড় হয়ে আমার আত্মীয়দের মুখ থেকে শুনেছি, ঠিক ওই সময় আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যায় চীর অচেনা দেশে , বাবার ব্রেন টিউমার ছিল, সেই কারণে বাবার মৃত্যু হয়। বাবা ছিল হাই স্কুলের একজন শিক্ষক আর আমার মা চাকরি করতো প্রাইমারি স্কুলে। বাবার মৃত্যুর পরে আমার মা পড়ে গিয়েছিল অথৈ সাগরে , আমার মাকে পুনরায় বিয়ে দেয়ার জন্য আমার নানা বাড়ি এবং দাদা বাড়ি থেকে অনেকবার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমার মা রাজি হয় না, কারন আমার মায়ের ছিলাম আমি এবং আমার ছোট্ট একটি বোন। মা বারবার বলেছিল আমার এই দুইটি সন্তান নিয়ে আমি আমার বাকি জীবনটা পার করে দিতে চাই। কারণ আমি চাইনা আমার সন্তানেরা বড় হয়ে জানুক যে আমি পুনরায় বিবাহ করেছিলাম । হয়তো বিবাহের পর মা ভেবেছিল আমাদের প্রতি তার আন্তরিকতা কমে যাবে । ভাড়া বাসায় থাকতাম সেখানে ভাড়া দিয়ে থাকা সম্ভব হলো না বাবার মৃত্যুজনিত কারণে। ঠাই হলো আমাদের নানার বাসায় ছোট্ট দুটি ঘরের মধ্যে। আমি আমার ছোট্ট বোনটি সেখানেই মানুষ হতে থাকলাম। ছোট্টবেলা থেকে দেখেছি বুঝেছি আমার মাই আমার বাবা আমার মা আমার মা । তোমাকে কত কত কষ্ট করতে দেখেছি কখনো খেয়ে না খেয়ে আমাদের খাবার ব্যবস্থা করেছেন। আমরা যেন কোন কিছুতে কমতি না হই সেই জন্য তিনি কতই না পরিশ্রম করেছেন। আমাদের খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে পোশাক আশাকে ভালোবাসায় আন্তরিকতায় কোন কিছুতেই কমতি রাখিনি আমার মা । বাবার স্মৃতি নিয়ে আর আমাদের দুই ভাই বোনকে নিয়ে দুর্বি সহ জীবন পাড়ি দিয়েছেন আমার মা। নিরলস পরিশ্রম করে আমাকে ডাক্তারিতে ভর্তি করিয়েছেন । আমি এখন ডাক্তারি পড়াশোনা করি। যখন ভালোমতো বুঝতে পেরেছি তখন মায়ের এই পরিশ্রম দেখে বুকের ভিতর হাহাকার করতো, কষ্টে বুকটা ফেটে যেত, মাকে কিছু বুঝতে দেইনি। হয়তো মা বুঝতে পারলে আরো কষ্ট পাবে । মনে মনে চিন্তা ছিল কিছু একটা করতে পারলে জীবনের প্রথম মাকে একটা সুন্দর সারপ্রাইজ দিবো । অনেক দিনের পরিকল্পনা ছিল, তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে চিন্তা করলাম মাকে কি সারপ্রাইজ দেবো, পরিকল্পনা করে ঠিক করলাম সুন্দর একটি দিন হচ্ছে বিশ্ব মা দিবস এই দিনটিকে বেছে নিয়ে চিন্তা করলাম মাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাব । আমার জমানো টাকা নিয়ে মাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে। পরিকল্পনা ছিল আজ আমার এই জনম দুঃখী মাকে নিয়ে একটা দিন আমি নিভুতে কাটাবো, আমার সঙ্গে থাকবে শুধু আমার মা। কোন ভাবে রাজি হচ্ছিল না শত কষ্টে রাজি করিয়ে মাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে। জীবনের প্রথম ইনকাম করা টাকা দিয়ে মাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছি , নিজের কাছে মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ । আমার পাশে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিধাতার শ্রেষ্ঠ উপহার আমার মা । আজ মায়ের সঙ্গে সারাদিন ঘুরবো মনে হতেই আনন্দ দুচোখ দিয়ে বারবার অশ্রু পড়ছে। আমি বারবার সেই সেই অশ্রু মায়ের নিকট থেকে গোপন করার চেষ্টা করছি । সবচেয়ে স্মৃতিময় সবচেয়ে আনন্দময় দিন টি ছিল এটি মায়ের সঙ্গে কাটানো । সেই স্মৃতি আজ লিখতে বসেছি, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য মায়ের প্রিয় রঙের শাড়ি নিয়ে মায়ের সামনে হাজির হলাম, মা আমাকে দেখে চমকে উঠল । আমি তখন মাকে বললাম , "মা এই শাড়িটা পড়ো আজ আমরা দুজন বাইরে ঘুরতে যাব "। মা কিছুতেই রাজি হয় না আমিও নাছোড়বান্দা, মাকে নতুন শাড়ি পরিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হলাম আমি আর আমার মা। দুজন পাশাপাশি বসে রওনা দিয়েছে উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। মা অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বলল, " আমার সন্তান আজ কত বড় হয়ে গেছে নিজের টাকা দিয়া আজ আমাকে শাড়ি কিনে দিয়ে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে "। আমার দিকে চেয়ে থেকে কিছুক্ষণ পর দেখলাম মার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরে পড়ছে। আমি বললাম, " মা তুমি কাঁদছো ? "। মা আমার দিকে অপলক চেয়ে থেকে বলল , "বুঝবি না বাবা এ হচ্ছে আনন্দ অশ্রু। " তোর বাবা বেঁচে থাকার সময় তখন তুই আমি আর তোর বাবা কত ঘুরতে বেরিয়েছি। অনেকদিন পর আজ তোর বাবার কথা মনে পড়ছে। তোর বাবা যদি পৃথিবীতে বেঁচে থাকতো তাহলে কতই না খুশি হতেন। সারাটা দিন আমরা হাত ধরে ঘুরে বেড়িয়েছি বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের এপার থেকে ওপার।দুজনের মধ্যে সেদিন সারাদিনই গল্প ছিল আমাদের ফেলে আসা মধুর সেই দিনগুলোকে নিয়ে। বাবা- আমাকে কিভাবে আদর করত আমরা সবাই কিভাবে বাইরে ঘুরতে যেতাম। আমাদের সুন্দর দিনগুলো কিভাবে কেটে যেত , সেই কথাই স্মৃতিরই গুলোই আলাপচারিতার ভিতরে বারবার ঘুরে ফিরে আসলো। মার মুখ দেখে মনে হল মা আজ প্রচন্ড খুশি। কারণ একজন মায়ের কাছে একজন সন্তানের সফলতায় সবচেয়ে বড় প্রাপ্য। মার জীবনের সেই কষ্ট আর বিভীষিকাময় দিনগুলির কথা নিয়ে অনেক আলাপ হলো। কিভাবে তার কষ্টের দিনগুলি কেটেছে। কিভাবে সে আমাদেরকে মানুষ করার জন্য পরিশ্রম করেছে। যতবার মায়ের কাছ থেকে সেই দিনগুলির কথা শুনেছি ততবারই শুধু দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝরে পড়েছে অশ্রু। মা এবং সন্তানের ভালোবাসার যে চরম একটি সুন্দর বন্ধন তৈরি হতে পারে , এটি আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম ওই দিনে । ওইদিনই বুঝতে পেরেছিলাম নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে মায়েরা সন্তানকে মানুষ করার চেষ্টা করে। বিনিময়ে কিছুই চায় না। চায় শুধু সন্তানের একটু ভালোবাসা। যেন জীবনের বাকিটা সময় সন্তান তার পাশে থাকে, সন্তান হয়ে দাঁড়ায় তার বৃদ্ধ বয়সের হাতিয়ার। বুঝতে পারার পর থেকে মায়ের কষ্ট পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পেরেছি।। আর আজ উপলব্ধি করতে পারলাম একজন মা তার সন্তানের কাছে কি চাই? মাকে বুকে আগলে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম মা তুমি আমার জীবনের সবকিছু । তুমি আমার জীবনের সব , আমার জীবনের সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিয়ে তোমাকে সুখি রাখার চেষ্টা করব। এ আমার প্রতিশ্রুতি না আমার জীবনের কঠিন ওয়াদা । ঐ ওই দিনের উপলব্ধি থেকে বুঝেছি পৃথিবীতে মা পাশে থাকলে কোন সন্তানই গরিব নয় , কোন সন্তানই অসহায় নয়, কোন সন্তান পৃথিবীর বুকে একা না। পৃথিবীর বুকে মা যেখানে আমার কাছে মনে হয়েছে একজন সন্তানের ভালোবাসার ঘর সেখানে । পৃথিবীর বুকে মা যেখানে সন্তানের জন্য বেহেস্ত সেখানে।

Share বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন